ঢাকা,  মঙ্গলবার
১৬ এপ্রিল ২০২৪

The Daily Messenger

পদ্মা সেতুতে বদলে গেছে শরীয়তপুরের অর্থনীতি

নুরুল আমীন রবীন, শরীয়তপুর

প্রকাশিত: ২০:২৬, ২৫ জুন ২০২৩

পদ্মা সেতুতে বদলে গেছে শরীয়তপুরের অর্থনীতি

ছবি : টিডিএম

পদ্মা সেতু চালুর বছর না ঘুরতেই পাল্টে গেছে শরীয়তপুরের উন্নয়নের চিত্র। সহজ হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। জেলায় বেড়েছে বিনিয়োগ। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্পকারখানা। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান। কৃষি অর্থনীতিতেও এসেছে আমুল পরিবর্তন। প্রথমবারের মতো শরীয়তপুরে উৎপাদিত সবজি যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে। পরিবর্তন এসেছে আর্থ-সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার।

শরীয়তপুর জেলা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। পদ্মা সেতু চালুর এক বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কৃষি খাতে। প্রথমবারের মতো শরীয়তপুরের জাজিরায় উৎপাদিত সবজি যাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এখানকার সবজি বিক্রি হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের চেইন শপে। স্থানীয় বাজার থেকে ২০ শতাংশ বেশি দামে রপ্তানিকারকদের কাছে সবজি বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে কৃষকও। ফলে কৃষি উৎপাদনে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকের। পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা সরাসরি জাজিরা থেকে সবজি ক্রয় করছেন। ফলে দেশের বাজারে কৃষি পন্যের ভালো দাম পাচ্ছে কৃষকেরা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় ভোগান্তি কমেছে যাতায়াতে। প্রসার ঘটেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। ছাড়াও শরীয়তপুরের জাজিরা মাদারীপুরের শিবচরে ১২০ একর জমিতে শুরু হয়েছে শেখ হাসিনা তার পল্লীর কাজ। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ। পদ্মা সেতু চালুর পর জেলার গোসাইরহাটর প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে উঠেছে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প কারখানা। চার মাস যাবৎ উৎপাদনে থাকা এই কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন ৭৫ জন নারী পুরুষ। মাছের খাদ্য উৎপাদনের কারখানাও গড়ে উঠেছে শরীয়তপুরের বিসিকে। পদ্মা সেতু ঘেঁষা নাওডোবায় গড়ে উঠছে আধুনিক মানের রেস্তোরাঁ।

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে জেলার পরিবহণ সেক্টরে। দীর্ঘ ১৮ বছর বন্ধ থাকার পর পদ্মা সেতুর বদৌলতে গত বছরের ২৬ জুন চালু হয়েছে শরীয়তপুর-ঢাকা সরাসরি বাস চলাচল। সেতু চালুর পর এই খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। শতাধিক ব্রান্ড নিউ এসি, নন এসি বাস যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যবসায়।

জাজিরার নাওডোবা এলাকার কৃষক মোকলেস মাদবর জানান, আগে নিরাশা চাষী বাজারে পাইকাররা আসতো না। ট্রাকে করে সবজি ঢাকায় পাঠাতে গেলে ফেরিতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায় থাকতে হতো। অনেক সময় সবজি পচে নষ্ট হয়ে যেত। পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা ট্রাক নিয়ে এই বাজার থেকে সরাসরি সবজি নিয়ে যাচ্ছে। এখন আর আমাদের সবজি নিয়ে বিক্রির জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। এখানকার সবজি এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাজার মূল্য থেকে ২০ বেশি দাম দিয়ে রপ্তানি কারকরা এখান থেকে সবজি কিনছে। এতে করে আমরা কৃষকরা লাভবান হচ্ছি। রপ্তানি উপযোগী সবজি উৎপাদনে কৃষিবিভাগ আমাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

গোসাইরহাটে প্রতিষ্ঠিত জেলার একমাত্র পোশাক কারখানা মিরহা এন্ড নাভা ফ্যাশনে শুরু থেকেই কাজ করছেন কোদালপুরের রেহানা খাতুন। তিনিদ্যা ডেইলি ম্যাসেঞ্জার’কে বলেন, ঘরে গৃহিণীর কাজ করতাম। স্বামীর একার আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন স্বামীর সাথে সমানতালে আমিও আয় করছি। এতে আমাদের সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে। সন্তানকে এখন ভালো স্কুলে লেখাপড়া করাতে পারছি। আমার মতো এখানকার অনেক নারীর ভাগ্য বদলে দিয়েছে এই কারখানা।

মিরহা এন্ড নাভা ফ্যাশনের পরিচালক আব্দুল্লাহ হোসাইন বলেন, ঢাকা থেকে কম খরচে পোশাক উৎপাদন করতে পারছি এখানে। ঢাকায় পন্য পরিবহনেও সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। পদ্মা সেতু চালুর পর নিজ এলাকায় পোশাক তৈরির কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেই। এখন এখানে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পদ্মার সেতু থেকে গোসাইরহাট পর্যন্ত অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যুৎ সংকটে দুশ্চিন্তায় আছি।

জাজিরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন বলেন, জাজিরার উৎপাদিত সবজি এখন ইউরোপের সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি সুইডেনে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। কত ডিসেম্বরে রপ্তানিকারক, কৃষক, পাইকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবজির রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়। রপ্তানি উপযোগী সবজি উৎপাদনে ১৫ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এখন কন্টাক্ট ফার্মিং এর মাধ্যমে জাজিরার সবজি ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে। পদ্মা সেতু এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকার খুব নিকটে হলেও শরীয়তপুরে শিল্পায়ন হয়নি। পদ্মা সেতু চালুর পর অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কৃষি খাতে। বর্তমানে এখানকার সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণে ঢাকার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাজিরায় একটি সবজি প্যাকেজিং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

টিডিএম/এএম

dwl
×
Nagad