ঢাকা,  শনিবার
২০ জুলাই ২০২৪

The Daily Messenger

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার তুঙ্গে পটুয়াখালীর ডিসি স্কুল!

পটুয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৭:০৯, ৮ নভেম্বর ২০২৩

অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার তুঙ্গে পটুয়াখালীর ডিসি স্কুল!

ছবি : মেসেঞ্জার

পরীক্ষার আগে নারী শিক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে সাজেশন ও প্রশ্নপত্র দেয়ার নামে যৌন হয়রানি করেন পটুয়াখালীর কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষকরা। লোকলজ্জার ভয়ে এসব সহ্য করে যাচ্ছেন বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।

এছাড়াও নানান সময় নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, কটূক্তি, অশ্লীল অঙ্গ-ভঙ্গীতে লিপ্ত হয়ে থাকেন ডিসি স্কুলের পুরুষ শিক্ষকরা। এছাড়াও নারী শিক্ষার্থীদের সাথে পরীক্ষার হলে ঢুকে অশ্লীল আচরণে জড়ান শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়ার জেরে পরীক্ষার হলে দেখানো হয় ভয়ভীতি, প্রভাবিত করা হয় ফলাফল। পড়তে না আসলে পরীক্ষায় ফেল ও পছন্দের শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নজীর রয়েছে। পটুয়াখালী ডিসি স্কুলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এসব লিখিত মন্তব্য করেন শিক্ষার্থীরা।

এসব ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও প্রধান শিক্ষককে জানালে ন্যূনতা প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযুক্ত শিক্ষকদের পক্ষ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবাতেন প্রধান শিক্ষক। শুধু তাই নয়, আলোচ্য এসব ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের রোষানলে পরেছে কয়েকজন শিক্ষক।

এছাড়াও শিক্ষকদের পেশাগত আচরণ, অদক্ষতা, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনা চলমান থাকায় ওই প্রতিষ্ঠানে পড়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন শিক্ষার্থীরা। 

শিক্ষার্থীরা বলেন, সঠিক তদারকির কাড়নে প্রশংসিত প্রতিষ্ঠানটি নানা বির্তকে জর্জরিত। সে প্রতিষ্ঠানে পড়ে কী হবে? এসব কারণে শিক্ষার্থীরা একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হবেনা বলে সাফ জানান। তবে এস এস সি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে একই বিদ্যালয়ের কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য আগে থেকেই চাপ সৃষ্টি করছেন, এমনকি যাতে কেউ অন্য কোথায় ভর্তি হতে না পারে সেজন্য চুক্তিনামায় স্বাক্ষর দিয়ে এডমিট কার্ড নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। 

শিক্ষার্থীদের আইডি কার্ডের জন্য ৩৫০ টাকা করে ধার্য্য করে টাকা নিলেও দুই বছরেও তাদের আইডি কার্ড দেয়া হয়নি। এসবের জন্য প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহ জালালের স্বেচ্ছাচারীতা ও অদক্ষতাকে দায়ী করছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবক।

বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে “দ্যা ডেইলি ম্যাসেন্জার”কে বলেন, শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি করে হাতিয়ে নেন আমাদের অভিভাবকের অর্থ। তাছাড়া ক্লাস টেস্টের ফি, পরীক্ষার ফি এর জন্য অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয় যেটা আমাদের সকল শিক্ষার্থীদের দেয়া সম্ভব নয়। পরীক্ষার হল পরিবর্তনের জন্য আমরা একাধিকার প্রধান শিক্ষকের কাছে গেলে আমাদের গাল মন্দ করে পাঠিয়ে দেন।

অভিযোগ সূত্র বলছে, ২০১৬ সালে ব্যবসায়ী এবং জেলা পরিষদের অর্থায়নে জেলা প্রশাসক শামীমুল হক সিদ্দিকী শহরের প্রাণকেন্দ্রে ডিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠান করেন। ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্য ব্যতি রেখে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা করে জেলা প্রশাসন। 

প্রথমদিকে প্রশংসা পেলেও পর্যায়ক্রমে ভর্তি ও কোচিং বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরে প্রতিষ্ঠানটি। প্রধান শিক্ষক অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত থেকে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি নেয়ায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ও বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। যে কারণে এসএসসিসহ সকল পরীক্ষা ফলাফলের মান ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। 

এছাড়াও অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে টিসি পাওয়া শিক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে ভর্তি নেয়া হয়। ২০ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত ওঠে ভর্তির দরদাম। পাঠ্যবই কিনতে প্রধান শিক্ষকের প্রেসক্রিপশন নিতে হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এসব নিয়ে মতামত পোষণ করলে অসদাচরণে লিপ্ত হন প্রধান শিক্ষক। নানাবিধ কারণে কোচিংয়ে অংশ না নিলে পরীক্ষা হল এবং ক্লাসে নাজেহাল হতে হয় শিক্ষার্থীদের। মাসে চারদিন পড়িয়ে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ১৫’শ টাকা নেয়া হয়।

এছাড়াও অর্থের বিনিময় মেধাবী শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ-অনুত্তীর্ণ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ একাধিক শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের। এসব নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে তাদের পরীক্ষা হলে নাস্তানাবুদ করে অনিয়মে জড়িত শিক্ষকরা। 

একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, অবস্থা দৃশ্যে নানাবিধ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। যা তৎকালীন ডিসিকে অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু কোন প্রতিকার মেলেনি, তাই একাদশ শ্রেণীতে সন্তানকে অন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াবো। 

শুধু নামেই ডিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রকৃতপক্ষে জেলা প্রশাসন থেকে কোন তদারকি নেই। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানীর মত ন্যক্কারজনক ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

অপর এক অভিভাবক বলেন, ‘২০২২ সালের ভর্তি পরীক্ষায় তার সন্তান অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল। পরে তার সন্তানকে ভর্তি নিতে প্রধান শিক্ষকদের ধর্না ধরলে তিনি ওই অভিভাবককে জেলা প্রশাসনের বরাতে ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষকের স্নেহভাজন এক শিক্ষক মাধ্যমে ২০ হাজার টাকায় তার সন্তানকে ভর্তি করান তিনি। 

জেলা প্রশাসনের এক কর্মচারী বলেন, তার নিকটতম আত্মীয়ের মেয়েকে ভর্তি নিতে প্রধান শিক্ষককে অনুরোধ করলে প্রধান শিক্ষক তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। পরে ২৫ হাজার টাকায় ভর্তি করান ওই শিক্ষার্থীকে। 

জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এর আস্কারায় প্রধান শিক্ষক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় জড়িয়ে পরেন। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তা অন্যত্র বদলির পূর্বে প্রধান শিক্ষকের চুক্তিনামাটি নবায়ন করলে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

যৌন হয়রানীর অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক মোঃ. শাহ জালাল বলেন, এসব তথ্য আপনি পেলেন কোথায়? তথ্যসহ যদি আপনি আমার কাছে উপস্থিত হন তাহলে জবাব দেবো। 

কোচিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী জানুয়ারি থেকে প্রাইভেট পড়ানো হবেনা।

এসব ঘটনা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারের নজরে আনা হলে তিনি বলেন, বেশ কিছু বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক ও মতামত নেয়া হয়েছে। সঠিক তথ্য ও অভিযোগ পেলে বিষয় গুলোকে খতিয়ে দেখবো। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিক ভাবে পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ তদারকিসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মেসেঞ্জার/মানিক/আপেল