ঢাকা,  মঙ্গলবার
১৮ জুন ২০২৪

The Daily Messenger

১০০ বছর পূর্ণ করল শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট পোস্ট অফিস

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬:৪২, ১৭ নভেম্বর ২০২৩

১০০ বছর পূর্ণ করল শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট পোস্ট অফিস

ছবি : মেসেঞ্জার

১০০ বছর পূর্ণ করল শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট পোস্ট অফিস। চলতি বছর এই পোস্ট অফিসটি প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯২৩ সালে শ্রীমঙ্গল উপজেলার জেমস ফিনলে চা কোম্পানির কালীঘাট চা বাগানে এই পোস্ট অফিসটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার নাম দেওয়া হয় কালীঘাট পোস্ট অফিস।

কালীঘাট পোস্ট অফিসের সাব পোস্ট মাস্টার তুষার কান্তি দত্ত পুরকায়স্থ জানান, কালীঘাট পোস্ট অফিস বৃহত্তর সিলেটের চা শিল্পাঞ্চলের প্রথম ও প্রাচীন পোস্ট অফিস। ব্রিটিশ আমলে সুদূর ব্রিটেন থেকে যেসব টি প্লান্টার্সরা শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে এসেছিলেন সুদূর ব্রিটেনে তাদের পরিবার-পরিজন ও সবুজ সোনা বিপণনে
পত্র যোগাযোগের প্রয়োজন দেখা দিলে এই পোস্ট অফিসটি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশরা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, উপমহাদেশে প্রথম ডাক সার্ভিস চালু করা হয় ১৭৭৪ সালে। ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। স্থায়ীভাবে প্রথম ডাক টিকেট চালু করা হয় সিন্দুতে ১৮৫২ সালে।

সর্বভারতীয়ভাবে ডাক টিকেট চালু হয় ১৮৫৪ সালে। উপমহাদেশে রেলওয়ে ডাক চালু হয় ১৮৫৩ সালে। পোস্ট কার্ড ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয় ১৮৭৯ সালে। পোস্টাল অর্ডার সার্ভিস চালু হয় ১৮৮১ সালে। পোস্টাল ব্যাংক সার্ভিস চালু হয় ১৮৮২ সালে এবং বিমান ডাক চালু হয় ১৯১১ সালে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর মতো উপমহাদেশে এবং এদেশেও ডাক বিভাগে লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। ডাক বিভাগের সেবা পৌঁছে গেছে শহরের সীমা ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ডাক বিভাগ প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। ডাকপিয়ন, রানার, পোস্টমাস্টার ও অন্যান্য কর্মচারী কর্মকর্তা মিলিয়ে অনেক লোকবল রয়েছে ডাকবিভাগের।

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট পোস্ট অফিসে বর্তমানে স্টাফ রয়েছেন ৩ জন। সাব পোস্ট মাস্টার, পোস্টম্যান এবং একজন রানার রয়েছেন। বর্তমানে এই পোস্ট অফিসে চিঠিপত্র খুব একটা আসে না বললেই চলে। 

সাব পোস্ট মাস্টার তুষার কান্তি জানান, এক সময়ের কর্মচঞ্চল এই পোস্ট অফিসটিতে এখন দৈনিক গড়ে ১৪/১৫ টি চিঠি ও রেজিস্টার্ড চিঠি আসে। আসে বিভিন্ন জনের ইন্টার্ভিউ কার্ডও।

জানা যায়, ১৯২৩ সালে টিন দিয়ে তৈরি পোস্ট অফিসটি লাল রং করে রাখা হয়েছিল। এখনও সেই লাল রঙেরই আছে। পোস্ট অফিসটির মুল দরজার ওপর একটি সাইনবোর্ড সাঁটানো আছে। সাইনবোর্ডের লেখাগুলোও লাল কালির লেখা।

জানা যায়, এটিই চা শিল্পাঞ্চলের প্রথম পোস্ট অফিস। সেই সময় এ অঞ্চলের চা বাগানের মালিক ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। বাগান ব্যবস্থাপনায়ও ছিলেন ব্রিটিশরা। তারা থাকতেন চা বাগানের বাংলোতে। সেসময় চা বাগানে শ্রমিকের প্রয়োজন দেখা দিলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে শ্রমিক আনা হয়েছিল। তখন এ অঞ্চল ছিল ত্রিপুরা রাজার অধীনে। সেই সময় এই পোস্ট অফিসটি ছিল চা বাগানে পত্র যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮৮০ সালে শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তন হয়। ১৮৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আখাউড়া-কুলাউড়া-করিমগঞ্জ রেলপথ। এরপর ১৯১৯ সালের ১৬ জুলাই মনোরম টিলা ও সবুজ চা বাগান বেষ্টিত শ্রীমঙ্গলে ৫ হাজার ১৪৯ বর্গফুট জায়গার ওপর শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন স্থাপিত হয়। 

শ্রীমঙ্গলসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার পর থেকে উৎপাদিত সবুজ সোনা বিপণনে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত মালামাল পরিবহনের জন্য অবকাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। বাণিজ্যিক প্রয়োজনে এবং তদানিন্তন আসাম এবং পূর্ব বাংলার আর্থসামাজিক উন্নয়নে সে সময়কার ব্রিটিশ আমলে ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে। এসব রেলপথ প্রতিষ্ঠার ফলে ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম প্রথম ব্রিটিশরা তাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে পত্র পাঠিয়ে যোগাযোগ করতেন এ পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনেও এই পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পত্র যোগাযোগ হতো। পরে ধীরে ধীরে এই পোস্ট অফিসের সুবিধা ভোগ করতে থাকেন বাগানে বসবাসকারী শ্রমিকসহ অন্যরাও।

স্বাধীনতার পর এ অঞ্চলে মানুষজনের বসতি বেড়ে গেলে এই পোস্ট অফিসটির কার্যক্রম বেড়ে যায় বহুলাংশে এবং কর্মচঞ্চল হয়ে পড়ে পোস্ট অফিসটি।

ব্রিটিশদের পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগ, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে চা-বাগানের সাথে যোগাযোগের জন্যও চিঠি আদান-প্রদান বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে চা শিল্পাঞ্চলে কর্মরত ব্রিটিশ টি প্লান্টার্স ও কর্মচারীদের বহির্বিশ্বের সাথে পত্র যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে এ পোস্ট অফিসটি।

চিঠির প্রয়োজনীয়তা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। চিঠির স্থান এখন দখল করে নিয়েছে ই-মেইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যমগুলো। কিন্তু চিঠির আবেদনই আলাদা। 

ডাক পিয়নের বাইসাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ ও বাসা-বাড়ির কলিংবেল শুনে দরজা খুলে ডাকপিয়নের কাছ থেকে চিঠি নেওয়ার সে আনন্দই অন্যরকম ছিল। বর্তমান আধুনিক ব্যবস্থায় এবং উন্নত যোগাযোগ মাধ্যম থাকায় শতবর্ষের এ পোস্ট অফিসটির এখন খুব একটা কদর নেই। চিঠি আদান-প্রদান হ্রাস পেয়ে এখন দৈনিক ১৫/১৬ টিতে দাঁড়িয়েছে।

মেসেঞ্জার/কাজল/আপেল

Advertisement