ঢাকা,  শনিবার
২০ এপ্রিল ২০২৪

The Daily Messenger

বাংলাদেশ স্কাউটসের কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতি

কোরিয়া জাম্বুরিতে অবৈধ পন্থায় ৬ হাজার কেজি চাল নিয়ে বিক্রি

প্রকাশিত: ২৩:১১, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আপডেট: ১২:৫০, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

কোরিয়া জাম্বুরিতে অবৈধ পন্থায় ৬ হাজার কেজি চাল নিয়ে বিক্রি

ছবি: ডেইলি মেসেঞ্জার

শিশুকিশোরদের নীতি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্কাউটসের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এবার ২৫তম কোরিয়া জাম্বুরিতে অবৈধ পন্থায় ৬ হাজার কেজি চাল ও ১ হাজার ৫০০ কেজি মশলা বিদেশে নিয়ে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এসব চাল প্রতি কেজি ১২শত টাকা দরে কোরিয়ায় বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ স্কাউটসের ৭৫০ জন সদস্য কোরিয়া জাম্বুরিতে অংশ নেন। প্রত্যেক সদস্যকে ৫ কেজি করে চাল ও ২ কেজি করে মশলা নিতে বাধ্য করা হয়। এ হিসাবে সদস্যদের মাধ্যমে নেয়া হয় ৩ হাজার ৭৫০ কেজি চাল ও ১ হাজার ৫০০ কেজি মশলা। আর বাকি চাল নেয়া হয় বিমানের কার্গোতে করে। কোরিয়ায় নেয়ার পর এই চাল ও মশলা আলাদাভাবে একত্র করে বিক্রি করে দেয়া হয়। এই জাম্বুরির কন্টিজেন্ট লিডার ছিলেন জাতীয় কমিশনার (আন্তর্জাতিক) মাহমুদুল হক ও জাতীয় কমিশনার (সি. ডি) কাজী নাজমুল হক নাজু ছিলেন ডেপুটি কন্টিজেন্ট লিডার।

২০২৩ সালের ১ থেকে ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত কোরিয়া জাম্বুরিতে অংশগ্রহণকারী একাধিক সদস্যের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রত্যেককে দিয়ে ৫ কেজি চাল ও ২ কেজি মশলা বিদেশে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদেরকে ৫ কেজি করে চাল সরবরাহ করে বলা হয়েছে-তোমাদের কন্টিজেন্ট ব্যাগে এটা নিয়ে যেতে হবে। যদি না নাও, তাহলে তোমাদের ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে। অংশগ্রহণকারীরা তাদের লাগেজে এই চাল বহন করায় পরিবহন খরচ লাগেনি। এই চাল ও মশলা দক্ষিণ কোরিয়ায় নেয়ার পর সেখানে ফুড হাউজে একত্রিত করে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে- খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা ছিলেন; তাদের একজন সাইফুল ইসলাম (পরিচালক, উন্নয়ন) এগুলো বিক্রি করেছেন। যদিও এ কর্মকর্তা ডেইলি মেসেঞ্জারের কাছে দাবি করেছেন তিনি বিক্রি প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত নন। সাইফুল ইসলাম মেসেঞ্জারকে বলেন, আমিও ৫ কেজি চাল নিয়েছি, অন্য সবাইও নিয়েছে। কিন্তু চাল একত্রিত করে বিক্রির প্রক্রিয়ায় আমি জড়িত নই। ঊর্ধ্বতনরা এ কাজ করেছে। আমি ফুড হাউজের সঙ্গে কাজ করেছি। 

মাহমুদুল হককে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে হোয়াটসআপে মেসেজ করলে সিন করেন এবং কী বিষয়ে জানতে চান তা জিজ্ঞেস করেন। এরপর এ প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে কোরিয়া জাম্বুরিতে অংশগ্রহণকারীদের (৭৫০ জন) প্রত্যেককে দিয়ে ৫ কেজি করে চাল নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চান। তিনি মেসেজ দেখলেও কোনো প্রতিউত্তর দেননি। তার কাছে পরবর্তী প্রশ্ন ছিল-এই চাল বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে, যা স্কাউটস নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি? এ প্রশ্ন সিন করলেও উত্তর দেননি। তার কাছে সর্বশেষ প্রশ্ন ছিল-আপনি সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে দু’বার বিদেশ সফর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়টি যদি একটু পরিস্কার করতেন। তিনি মেসেজ দেখলেও কোনো উত্তর দেননি।

কোরিয়া জাম্বুরিতে প্রত্যেক সদস্য ৫ কেজি করে চাল নিয়ে গিয়েছিল কেন? এবং এই চাল দক্ষিণ কোরিয়ায় নেয়ার পর বিক্রি করে দেয়া হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেপুটি কন্টিজেন্ট লিডার নাজমুল হক নাজু সোমবার ডেইলি মেসেঞ্জারকে বলেন, ফুড হাউজ চালানোর জন্য চাল নেয়া হয়েছিল। সবাই ৫ কেজি করে চাল নিয়েছে, আমি নিজেও নিয়ে গেছি। এই চাল বিক্রির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘ডেপুটি কন্টিজেন্ট লিডার হিসেবে তো চাল বিক্রির বিষয়টি আপনার জানার কথা।’-এমন প্রশ্নের উত্তরে এক পর্যায়ে নাজু বলেন, ‘ফুড হাউজের একটি কমিটি আছে, ওই কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা চাল কী করেছে, সেটা আমি বলতে পারবো না। ফুড হাউজের ম্যানেজার ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। আপনি তার সাথে কথা বলতে পারেন।’

সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আবদুল্লাহ আল মামুনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, আমি ফুড হাউজের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলাম না। আপনার আর কিছু জানার থাকলে আমাদের অফিসে আসেন।’

কোরিয়া জাম্বুরিতে প্রত্যেক সদস্য ৫ কেজি করে চাল নিয়ে গিয়েছিল কেন? এবং এই চাল দক্ষিণ কোরিয়ায় নেয়ার পর বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ স্কাউটসের নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব)  উনু চিং মারমা মেসেঞ্জারকে বলেন, জাম্বুরির তো কমিটি আছে, তারা কি নিয়ে গেছে; আর কী নিয়ে যায়নি; সেটা আমি বলতে পারছি না।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কোরিয়া জাম্বুরির হিসাব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা দেয়নি সংশ্লিষ্টরা। এমনকি এর আগের পর্তুগাল জাম্বুরির হিসাবও জমা দেয়া হয়নি, যেটার কন্টিজেন্ট লিডার ছিলেন নাজমুল হক নাজু।

বাংলাদেশ স্কাউটসের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কোরিয়া জাম্বুরিতে চাল নেবার বিষয়ে ওই দেশের পত্রিকায় নানাভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। চুরি করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মুভমেন্ট থেকেই বোঝা যায়। স্কাউটের একটা ভেল্যু আছে। ওখানে বাংলাদেশ কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দেশের বাইরে চাল নেওয়া বা রফতানির কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান ডেইলি মেসেঞ্জারকে বলেন, স্কাউটস সদস্যদের ফোর্স করে চাল নেয়া হয়েছে, এটা তো ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিস। পরিকল্পিতভাবে এটা করা হয়েছে, এর মানে বিষয়টি শুধু অনৈতিক নয়, এর শাস্তি হওয়া উচিত ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট।

এছাড়াও শিশুকিশোরদের মনন ও মেধা বিকাশ এবং সততা-নিষ্ঠা শেখানোর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তা।

দুর্নীতির দায়ে বাংলাদেশ স্কাউটস থেকে বহিষ্কৃত স্কাউট লিডার জুবায়ের ইউসুফকে অংশগ্রহণকারী হিসেবে মাহমুদুল হক কোরিয়া জাম্বুরিতে তার সফর সঙ্গী করেন। এ ঘটনা স্কাউটিংয়ে নজিরবিহীন।

এছাড়াও কোরিয়া ভ্রমণের বিমান ভাড়ায় টিকিট কেনায় এক কোটি ৫০ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করেছেন। এখন পর্যন্ত এই ভ্রমণের প্রায় ১০ কোটি টাকার হিসাব বাংলাদেশ স্কাউটসে জমা দেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই ধারণা করা হচ্ছে হিসাব জমা না দিয়েই সংশ্লিষ্টরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন।

মেসেঞ্জার/হাওলাদার

dwl
×
Nagad