ঢাকা,  শনিবার
২৫ মে ২০২৪

The Daily Messenger

শিশু বৃদ্ধ রোগীর চাপ বাড়ল দেশের সব হাসপাতালে

আবদুর রহিম ও এম সাইফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০১:৪১, ২৫ এপ্রিল ২০২৪

শিশু বৃদ্ধ রোগীর চাপ বাড়ল দেশের সব হাসপাতালে

ছবি : মেসেঞ্জার

দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। প্রচণ্ড গরমে বিপর্যস্ত জনজীবন। বাড়ছে গরমজনিত রোগের প্রকোপ। বেশি অসুস্থ হচ্ছেন শিশু ও বয়স্ক মানুষ। পেটের ব্যাথা, ঠান্ডাজ্বর, কাশি, সর্দি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, পানি শূন্যতা, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। বৃদ্ধদের অসুস্থতাও অধিক বেড়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতালে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। সিট না পেয়ে বারান্দায় শুয়েই অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- দিন ও রাতের তাপমাত্রায় খুব বেশি পার্থক্য না থাকায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এই গরমে সুস্থ থাকতে প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। এ ছাড়া প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতেও নিষেধ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে সব হাসপাতালেই গত এক শপ্তাহে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (শিশু হাসপাতাল), মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ , মিটফোর্ড হাসপাতালসহ সব খানেই বেড়েছে রোগীর চাপ। গত কয়েকদিনের গরমের কারণে  শুধু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর হাসপাতাল গুলোতে শতশত রোগী ভর্তি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলো ইতিমধ্যে শয্যা সংখ্যা পূর্ণ হয়ে মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় গত রোববার দুই বছরের মেয়ে আফিফাকে মুগদা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়েছেন মানিক নগরের বাসিন্দা ওবায়দুল করিম ও নাসিমা বেগম। তারা জানান, অতিরিক্ত গরমের মধ্যে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বাচ্চাটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।  

হাসপাতালে সেবা পেলেও অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে মেঝেতে শুয়ে সেবা নিতে হচ্ছে। সরেজমিনে মুগদায় গিয়ে দেখা গেছে- হাসপাতালের মেঝেতেই অনেকেই বাচ্চাকে নিয়ে বসে আছেন। তবে কেউ চিকিৎসা সেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ নয়। তাঁরা বলেন, ডাক্তাররা আন্তরিকতার সাথেই সেবা দিচ্ছেন।

মুগদা হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নিয়াতুজ্জামান ডেইলি ম্যাসেঞ্জারকে বলেন, তাপপ্রবাহের কারণে শিশুরা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। গত কয়েকদিনে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে আমার হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি। বয়স্ক রোগীও বেড়েছে। এছাড়া জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়ার রোগীও আছে। এখনো আমরা এটাকে অস্বাভাবিক দেখছি না। সবাই যদি সচেতন থাকে, বেশী বেশী তরল খাবারে মনোযোগী হয়, রোদ থেকে বেঁচে থাকা যায় ভালো হয়।   

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোতালেব মতিন ডেইলি  ম্যাসঞ্জোরকে বলেন, গ্রীষ্মকালে যখন বাইরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার উপরে উঠে যায় হিট স্ট্রোক তখন হতে পারে। হিটস্ট্রোক এর লক্ষণ সমূহ হচ্ছে, শরীরের চামড়া লাল বা শুষ্ক হয়ে যাওয়া, শ্বাসের গতি বৃদ্ধি পাওয়া, নাড়ির গতি বৃদ্ধি পাওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাবের রং গাড় হয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া। এর ঝঁকিতে বেশি থাকে বাচ্চা বা শিশুরা, বৃদ্ধ ও গর্ভবতীরা। যাদের কিডনি রোগ আছে বা যারা প্রেসার কমানোর জন্য ডাইওটিক্স জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করেন তারও ঝুঁকিতে থাকেন।

প্রতিরোধের কয়েকটি উপায়কে সামনে এনেছেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, অল্প করে পানি বারবার খেতে হবে। বড়দের দিনে আড়াই লিটারের বেশি দরকার হয় না তবে অতিরিক্ত ঘাম বা রোদে বেশি সময় ধরে থাকলে বশেি লাগবাে। লবণ ও লেবুর রস মিশিয়ে পানিতে খাওয়া যেতে পারে। প্রেসারের রোগী হলেও সোডিয়াম বা লবণ না কমিয়ে বরং পটাশিয়ামযুক্ত খাবার বেশি করে খেলে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হিট স্ট্রোকজনিত লবণের কমবেশি থেকে বাঁচতে পারবেন। যাদের বেশি ঝুঁকি আছে তাদেরকে দীর্ঘ সময় ধরে রোদে না রাখা এবং ছায়াযুক্ত স্থানে থাকার চেষ্টা করা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিয়েটিভ মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান ডেইলি মেসেঞ্জারকে বলেন, অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানিশূন্যতায় কয়েকটি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ সব বয়সী মানষের দেখা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে-মাথাব্যথা, ঘুমকম,মাংমপেশীতে ব্যথা, খাবারে রুচিহীনতা, ফুডপয়জনিং, কিডিনিতে সমস্যা ও এমনকি হিটস্ট্রক হতে পারে। অনেকের শ্বাসকষ্ট আছে সেটিও বেড়ে যেতে পারে। তবে, এর বাইরে শিশুদের প্রসাব কম হওয়া ও প্রসাবে ইনফেকশন দেখা দিতে পারে।

গোপালগঞ্জে শিশু ওয়ার্ডে বেশী রোগী: গোপালগঞ্জ আড়াইশ’ বেড জেনারেল হাসাপাতালে বাড়ছে রোগী। গড়ে প্রতিদিন আউটডোরে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন এক হাজার থেকে ১২শ’ রোগী। গতকাল বুধবার সকালে হাসাপাতালের ১০টি বিভাগে ২৯১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এরমধ্যে ডায়রিয়া ও শিশু ওয়ার্ডে রোগী সবচেয়ে বেশি। জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ঈদের পর গড়ে এ হাসপাতালে প্রতিদিন ২শ’ রোগী ভর্তি থাকতো। আউটডোরে ৮শ’ থেকে ১ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতেন। তাপপ্রবাহ শুরুর পর এই সংখ্যা বেড়েছে।

চুয়াডাঙ্গায় ডায়রিয়া-নিউমোনিয়া রোগীর চাপ: চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর। প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে সব বয়সীরা তীব্র গরমে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আর শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে নিউমোনিয়ায়। রোগীর চাপ এতটায় বেশি যে শয্যা সঙ্কটে পড়েছে রোগীরা। শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ডে বেড না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে অবস্থান করেছে। রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে দায়িত্বরত ডাক্তার ও নার্সরা।চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে শিশু ও ডায়রিয়া ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে নিউমোনিয়া আক্রান্ত শিশু রোগী ভর্তি ছিল ৭১ জন। আর এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে রোগী আসছে ৪০ থেকে ৫০ জন। তাদের সবার বয়স ৩ মাস বয়স থেকে ১ বছর পর্যন্ত। বেশিরভাগই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। গত এক সপ্তাহে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছে তিন শতাধিক রোগী। এদিকে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে রোগী ভর্তি ছিল ১৭১ জন। গত এক সপ্তাহে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিয়েছে পাঁচ শতাধিক রোগী।

লক্ষ্মীপুরে দ্বিগুণ রোগী: লক্ষ্মীপুরে প্রচণ্ড গরমে ডায়রিয়া ও সর্দি কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালসহ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অরুপ পাল জানান, গত তিন দিনে সদর হাসপাতালে প্রায় ৩০০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ডায়রিয়া, জ্বর, ঠান্ডা ও শ্বাস কষ্টের রোগীই বেশি। হাসপাতালে বেডের তুলনায় রোগী বেশি ভর্তি থাকলেও সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মাদারীপুরে তিলধারণের ঠাঁই নেই : টানা তীব্র দাবদাহে মাদারীপুর জেলার আড়াইশো শয্যার হাসপাতালের বেড়েছে রোগীর চাপ। প্রতিদিন এই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন শত শত রোগী। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর স্থান সংকুলান না হওয়ায় বারান্দাতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও বাড়ছে রোগীর ভিড়। এরমধ্যে শিশু ও বৃদ্ধের সংখ্যাই বেশি।মাদারীপুর জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. আবু সফর হাওলাদার বলেন, তীব্র গরমে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জেও বাড়ছে রোগী: কিশোরগঞ্জে রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জনের মতো শিশু ভর্তি হচ্ছে। অপরদিকে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এদিন দুপুরে হাসপাতাল দুটিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীরা বেড না পেয়ে মেঝেতে শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছেন। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তার-নার্স নিয়োজিত আছেন। বেডের সমস্যা থাকলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট নেই। কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। সবগুলো হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে তৈরি রাখা হয়েছে।

গাজীপুরেও অতিরিক্ত চাপ: গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যা হাসপাতাল ১০০ শয্যা হলেও জনবল কম থাকায় অতিরিক্ত তাপদাহে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এতে বেড কম থাকায় অনেকে রোগী মেঝেতেই পড়ে আছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়াজনিত রোগে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০ জন। চিকিৎসাধীন আরও ১০ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্মকর্তা ডাক্তার লুৎফর রহমান জানান, তাপদাহ না কমলে হয়তো এর সংখ্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।

মেসেঞ্জার/সজিব

Advertisement

Notice: Undefined variable: sAddThis in /mnt/volume_sgp1_07/tp4l1yw3zz9u/public_html/bangla/details.php on line 768