ঢাকা,  রোববার
২১ জুলাই ২০২৪

The Daily Messenger

সহজ কথায় অর্থনীতি

প্রকাশিত: ১৩:৫২, ৪ নভেম্বর ২০২৩

সহজ কথায় অর্থনীতি

ছবি : মেসেঞ্জার

শাস্ত্র হিসেবে অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের জীবনের যোগসূত্রটি নিত্যদিনের। সচেতনভাবে বা অবচেতনে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে যেমন তেমনি জাতীয় জীবনেও অর্থশাস্ত্রের তত্ত্বগুলোর যথাযথ প্রয়োগের ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে আমাদের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা।

আর বিশ্বায়নের এই যুগে তো বৈশ্বিক অর্থনীতির হিসাব-নিকাশও ক্রমে নিত্যদিনের বিষয় হয়ে উঠছে তাই জাতীয় অর্থনীতি বিষয়ক পরিকল্পনা তো বটেই, এমন কি পারিবারিক ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাগুলোকে বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। আশেপাশের এবং বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতার টানাপোড়েন নিরন্তর। আমাদের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখছে। আমাদের জীবনচলার এক নিত্যসঙ্গি হয়ে গেছে অর্থনীতির বিষয়াবলী। 

একটি উদাহরণ দেয়া যাক, মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি নতুন করে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে তার জেরে নতুন করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাবে বাড়বে পরিবহণের খরচ। আর বাড়বে সব ধরণের আমদানি করা পণ্যের দাম। ফলে আগে থেকেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে থাকা বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল তথা জীবন-যাপনের খরচ বাড়বে। তাছাড়া, মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে ক্রমেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর প্রভাবে হরতাল অবরোধ হচ্ছে। সে কারণেও নিত্যপণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। আর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সাধারণের ব্যবহার্য নিত্যপণ্যের দাম। তাই মূল্যস্ফীতিও বাড়ন্ত। ফলে আগামী কয়েক মাসে পারিবারিক খরচের পরিকল্পনায় যারা এ হিসবেটি মাথায় রাখবেন তারা বাকিদের চেয়ে কিছুটা বেশি কৌশলি উদ্যোগ নিতে সক্ষম হবেন। আর যারা এ হিসেব উপেক্ষা করবেন তাদের পারিবারিক বাজেটে যে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেবে তা পূরণ করা মোটেও সহজ হবে না।

মোদ্দাকথা- ব্যক্তি থেকে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের যে আকাঙ্ক্ষাগুলো থাকে আর সেগুলো পূরণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি জ্ঞানের যে শাখার কাজ তাই অর্থনীতি। অর্থনীতির এই ক্ল্যাসিক সংজ্ঞাটিতেই বোঝা যায় অর্থনীতি সবার বিষয়। বিষয়টি জীবনচলার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত। তাই তা ততোটা জটিল নয় যতোটা অর্থনীতিবিদরা বলার চেষ্টা করেন। আসলে এটি কমন সেন্সা বা সাধারণ জ্ঞানের বিষয়। অর্থনীতিবিদরাই তাদের পেশাগত কৌটিল্য ধরে রাখতে এটাকে অযথা জটিল করে রাখেন। অবশ্যি, ব্যতিক্রমও আছে অনেক অর্থনীতিবিদ আবার খুব সহজ করে বাজেট, মুদ্রানীতি, বৈদেশিক খাতসহ অর্থনীতির কঠিন বিষয়গুলো খুবই সহজ করে প্রকাশও করেন।

আর যেহেতু অর্থনীতি সবার বিষয়, ফলে অবশ্যই একে সবার কাছে বোধগম্য একটি বিজ্ঞান হিসেবে হাজির করাটাই ইন্টেলেকচুয়ালদের প্রধানতম দায়িত্ব। সে বিচারে বিরূপাক্ষ পালের লেখা 'সহাজ কথায় অর্থনীতি গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং উপযোগীও। তার এই বইটির প্রকাশনা উৎসবে আমি এসব কথা বলেছি। আমিও চেষ্টা করি অর্থনীতির কথাগুলো খুব সহজ করে প্রকাশের।

আমি নিজে লেখালেখি শুরুই করেছিলাম অর্থনীতির যে বিষয়গুলো সাধারণ অর্থে জনমানুষের কাছে কঠিন বলে দাবি করা হয় সেগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপনের দায় থেকে। বাংলায় অর্থনীতি লিখতে শুরু করি ১৯৭২ সাল থেকে। তখন লিখতাম দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা ও দৈনিক ইত্তেফাকে। পঞ্চাশ বছরেরও আগে শুরু করেছিলাম এই ধাঁচের লেখালেখি। এর পর থেকে সব সময়ই চেষ্টা করে যাচ্ছি আরও সহজ করে কিভাবে অর্থনীতিকে সবার কাছে তুলে ধরা যায়। তাই ‘সহজ কথায় অর্থনীতি' শিরোনামের গ্রন্থটি আমাকে বিশেষ অনুপ্রাণিত করেছে।

মাইক্রো ও ম্যাক্রো অর্থনীতির মৌলিক বিষয়গুলো উদাহরণ দিয়ে দিয়ে সহজ ভাষায় এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন লেখক বিরূপাক্ষ পাল। সেটিই প্রত্যাশিত। অর্থশাস্ত্র হিসেবে একটি অ্যাকাডেমিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে চান এমন যে কেউ এই সহজ ভাষার বর্ণনা থেকে উপকৃত হবেন নিঃসন্দেহে। আর সেই বর্ননায় যদি থাকে রম্য লেখকের মুন্সিয়ানা, যদি থাকে জীবন থেকে নেয়া উদাহরণ- তাহলে তা যে সুখপাঠ্য হবে সেকথা মানতেই হবে।

তবে আমার কাছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে এই বইয়ে দ্রব্যবাজার, মুদ্রাবাজার, এবং শ্রমবাজার আর এই তিন বাজারের সম্মিলন নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণ। বৃহত্তর জনপরিসরে এই তিন বাজারের আন্তঃসম্পর্ক এবং আন্তঃনির্ভরশীলতাকে কমই আলোচিত হতে দেখি। আর এই মুহূর্তে নিত্যপণ্যের বাজার যেমন উথাল পাতালা হয়ে গেছে তাতে এই বইটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

পত্র-পত্রিকার লেখালেখিতে আমরা যে নীতি-প্রস্তাবনা বা ইকোনমিক মডেলিং-সংশ্লিষ্ট পরামর্শ দিয়ে থাকি সেগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করতে এই তিন বাজারের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে একটি অ্যাকাডেমিক বোঝাপড়া থাকা খুবই দরকার। সে বিচারে এই গ্রন্থের গভীরতর পাঠ অর্থনীতি বিষয়ক লেখালেখি বোঝার ক্ষেত্রেও এক ধরনের নির্দেশক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমার মনে হয়।

তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত কলেবরে হলেও অর্থনীতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এ বইটিতে। রাজস্ব নীতি নিয়ে সরকার এবং মুদ্রানীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো অর্থনীতিতে যে 'এক্সেলারেটর ও ব্রেক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তা আলোচনায় আনাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। এখানে আলোচনাটা শুরু হয়েছে। আশা করি এ আলোচনাটি জনপরিসরে ভবিষ্যতে আরও বেশি বেশি আসবে। লেখক বিরূপাক্ষ পালের কাছে প্রত্যাশা থাকবে তিনি এ নিয়ে সহজবোধ্য ভাষায় আরও লিখবেন। কেননা অনেক সময় রাজস্ব ও মুদ্রানীতির গভীরতর এই সম্পর্কটি নীতি-নির্ধারকরা খুব ভালো বোঝেন সে কথাটি জোর দিয়ে বলা মুশকিল। আর না বোঝার কারণে একের বোঝা অন্যকে বহন করতে হয়। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি বেড়ে গেলে তা পূরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাঁধে বাড়তি টাকা ছাপানোর যে চাপ পড়ে তা অনেকেই ঠিক সেভাবে বুঝতেই চান না। আবার, তা ছাপালেও মূল্যস্ফীতি আরও তেতিয়ে ওঠে। তখন যত দোষ নন্দ ঘোষেরা।

এটা শুধু অর্থনীতির ছাত্রদের জন্য নয়, বরং সকলের জন্যই দরকারি। কেন দরকারি মনে করছি তার একটা ব্যাখ্যা দিতে চাই। ক'দিন আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকেও এমন কথাই বলেছি। রিজার্ভ ক্ষয় রোধ কিংবা মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে আমাদের নীতি-নির্ধারকরা প্রায়শই এমন উদ্যোগ/পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিত্যদিনের জীবনে কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেললেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু সবাই এই মুহূর্তের মুশকিল আশান করতে আগ্রহী। ভবিষ্যতে এ কারণে যে আরও বড়ো মুশকিলের উৎস তৈরি হতে পারে তা বুঝতে চান না। বোঝানের উদ্যোগও নেয়া হয় না।

কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের তাই অনুরোধ করেছিলাম এই আপাত দৃষ্টিতে কঠিন পদক্ষেপগুলো যে দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থেই নেয়া হচ্ছে তা বৃহত্তর জনগণকে বোঝাতে যেন শক্তিশালি কম্যুনিকেশন অভিযান অব্যাহত রাখা হয়। এতে মানুষের ভুল বোঝার আশঙ্কা কমবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থনীতির অন্য নীতি-নির্ধারকদের তরফ থেকে আমরা আরও গণমুখী কম্যুনিকেশন দেখতে পাবো। তবে এর বিপরীত ভাবনাও চলমান আছে। কেউ কেউ মনে করেন এসব বিষয় বেশি খোলাসা করলে স্পেকুলেশন' বা গুজব বাড়বে। এই আশঙ্কা  থাকা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি বা বিনিময় হারে প্রত্যাশা বা ‘এক্সপেক্টেশনা কে জনমনে গেড়ে বসতে দেয়া যাবে না। তাই নীতিনির্ধারকদের খানিকটা হলেও আগাম ‘নীতি-নির্দেশনা তথা ফরওয়ার্ড গাইডেন্স' দেবার সুযোগ রয়েছে। আর সাহস করে তা দিয়ে যেতে হবে।

তবে একই সঙ্গে ডিমান্ড সাইডের অংশীজন যারা অর্থাৎ যারা গ্রাহক তাদের নিজেদেরও অর্থনীতি সম্পর্কে বোঝাপাড়া জোরদার হওয়া চাই। সে জন্যই কোনো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কোন উদ্দেশ্যে নেয়া হয়ে থাকে সে সম্পর্কে তাদের একটা ধারণা থাকা দরকার। আর এ জন্যই অর্থশাস্ত্র বিষয়ক আলাপে এই বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আসা উচিৎ। বিরুপাক্ষ পালের এই গ্রন্থে সে চেষ্টা প্রশংসনীয় মাত্রায় হাজির আছে বলে মনে করি।

নতুন শতাব্দিরও এক-পঞ্চমাংশের বেশি আমরা পেরিয়ে এসেছি। অর্থনীতি যে কেবল কতিপয়ের জন্য নয় বরং বহু মানুষের জন্য কাজ করতে হবে তা এখন প্রতিষ্ঠিত। কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক হিসেব-নিকেশ থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হওয়া না-হওয়ার বিষয়গুলোও এখন মূলধারার আলোচনার বিষয়। অর্থনীতিতে নারীর অবদানকেও নতুন করে আরও পদ্ধতিগতভাবে দেখার ও বোঝার ধারা দাঁড়িয়ে গেছে। এ বছর হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ক্লদিয়া গোলডিন এ বিষয়ক কাজের জন্যই এবছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশেও এ নিয়ে কাজ হচ্ছে।

মোট কথা অর্থশাস্ত্র চর্চার এক নতুন দিগন্ত আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। জলবায়ু অর্থনীতি, সামাজিক ব্যবসা, এমএসএমই ও স্টার্ট-আপ, ডিজিটাল অর্থনীতি, নানো প্রযুক্তি সম্পর্কিত অর্থনীতি গিগ ইকোনমির মতো বিষয়গুলো আগামী দশকগুলোতে অর্থশাস্ত্র বিষয়ক আলাপ ও তর্কে কেন্দ্রীয় জায়গায় থাকবে বলে মনে হয়। আর বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় দেশগুলোর জন্য কৃষির বাণিজ্যিকিকরণ ও জলবায়ুবান্ধব লাভজনক কৃষিও একই রকম গুরুত্বের জায়গায় থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। সবুজ অর্থায়নের বিষয়টিও দ্রুতই সামনে চলে আসবে।

এই নতুন সময়ে অর্থনীতির চর্চাকে হতে হবে আরও বেশি সম্মুখমুখী, প্রযুক্তি-নির্ভর, পরিবেশ-বান্ধব, গণমুখী ও অংশগ্রহণমূলক। সকল অংশীজনকে সেই চর্চায় যুক্ত করার জন্য সহজ ভাষায় অর্থনীতির তত্ত্বগুলোর উপস্থাপন অপরিহার্য। সে কাজে একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে বিরূপাক্ষ পালের 'সহজ কথায় অর্থনীতি' গ্রন্থটি। নীতিনির্ধারকদের জন্যেও বইটি খুবই দরকারি হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাই গ্রন্থটি রচনার জন্য বিরূপাক্ষ পালের আন্তরিক ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমি আশা করবো সহজ ভাষায় লেখালেখির এই ধারাটি বেগবান রাখতে লেখক বিরূপাক্ষ পাল সদাসচেষ্ট থাকবেন, এবং তাকে দেখে আরও তরুণ লেখকরা একই পথে এগুবেন। যদিও ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে। তবুও আমাদের নিরন্তর চেষ্টা করে যেতে হবে অর্থনীতেক আরও সহজ ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশের।

লেখক : খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক।

মেসেঞ্জার/দিশা