ঢাকা,  মঙ্গলবার
১৬ এপ্রিল ২০২৪

The Daily Messenger

নদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও গণনাবিষয়ক বিভ্রান্তি

প্রকাশিত: ২২:২৬, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

নদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও গণনাবিষয়ক বিভ্রান্তি

ছবি : মেসেঞ্জার

বাংলা সাহিত্যের দু'জন প্রধান কবি 'নদী' শিরোনামে যে দু'টি কবিতা রচনা করেছেন তা সাহিত্য পদবাচ্য হলেও নদী বিষয়ক অনেক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে। রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, "নদী কোথা হতে এলো নাবি, কোথায় পাহাড় সে কোনখানে, তাহার নাম কি কেহই জানে", তখন নদীর উৎপত্তি ও গতিপথ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা আমরা পেয়ে যাই, যা নদীর বিশ্বজনীন সংজ্ঞার সঙ্গে মিলে। নদী সৃষ্টির আবশ্যিক পূর্বশর্তগুলোর অন্যতম হচ্ছে; পানির স্থায়ী এবং প্রাকৃতিক উৎস। সেটি বরফ গলা পানি অথবা বৃষ্টির পানিও হতে পারে। বৃষ্টি সারা বছর নাও হতে পারে। ফলে নদীর সৃষ্টির জন্য বৃষ্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক নয়। তবে বৃষ্টিবহুল অববাহিকা বিশেষ করে মেঘালয়-চেরাপুঞ্জি এলাকায় এটি খুবই গুরুত্ববহ। পৃথিবীর অন্যত্র পাহাড় চূড়ার বরফ গলা পানি থেকেই নদী সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ তার নদী কবিতায় পাহাড়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও নদীর সৃষ্টির জন্য অন্য শর্তগুলো হচ্ছে, ভূমির স্বাভাবিক ঢাল, একটি নির্দিষ্ট গতিপথ বা নদীখাত এবং নিয়মিত প্রবাহ। তবে প্রবাহ মৌসুমভেদে শীর্ণ অথবা শুষ্ক হতে পারে। তাতে নদীর সংজ্ঞার তারতম্য ঘটে না। এদিক থেকে জাতীয় নদী কমিশনকৃত নদীর সংজ্ঞা পানি বিজ্ঞানের বিশ্বজনীন সংজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু নদীর সংজ্ঞা নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষত হিন্দু পুরাণ ও বাংলা সাহিত্যে নানান ধরনের স্ববিরোধী ধারণা ছড়িয়ে রয়েছে। এই ধারণাগুলো সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণকে জটিল করে তুলছে এবং নদীর সংখ্যা ও গণনার কাজকেও কঠিন করে তুলছে। এই ভুল ধারণাগুলোর নিরসন প্রয়োজন। তারানাথ তর্কবাচস্পতি রচিত বাচস্পত্য অভিধানে (১৮৭৩-৮৪) নদীর দৈর্ঘ্যের (৯ মাইল ১৬০ গজ) যে পরিমাপ উল্লেখ করা হয়েছে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি জানা নেই। আবার ড: মুহম্মদ এনামুল হক এবং শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে' ও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। এখানে "চার ক্রোশের অধিক বাহিনী জলনালিকে" নদী হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই দৈর্ঘ্যের ভিত্তি কি সেটিও জানা নেই। প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ও প্রবাহিত কোনো জলপ্রবাহ ভূমির ঢাল বেয়ে নির্দিষ্ট খাত ধরে নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয়ে সাগর, উপসাগর বা অন্য কোন জলাশয়ে পতিত হলে তাকে নদী বলা হয়। এটি একক্রোশ দৈর্ঘ্যের হতে পারে ; এমনকি দশ ক্রোশ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট ও হতে পারে। এখানে দৈর্ঘ্য বিষয়ক বাধ্যবাধকতা নেই।

নদীর সংজ্ঞা বিষয়ক আর এক ধরনের বিভ্রান্তি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবলভাবে লক্ষ্যণীয়। প্রায়শই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় নদ ও নদীর মধ্যে কোন পার্থক্য রয়েছে কিনা? বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান এবং আধুনিক বাংলা অভিধানে নদী শব্দের পুংলিঙ্গ হিসেবে 'নদ' উল্লেখ করা হয়েছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত 'সরল বাঙ্গালা অভিধানে' বলা হয়েছে , "যেগুলির নাম পুংবাচক তাহাদিগকে নদ বলা হয় এবং যেগুলির নাম স্ত্রীবাচক তাহাদিগকে নদী বলা হয় "। কোনো কোনো মনীষী পুরান অনুসারে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যেসব জলপ্রবাহের সৃষ্টির সঙ্গে দেবতার (পুরুষ) সম্পর্ক রয়েছে সেসব জলপ্রবাহের নাম পুরুষবাচক - যেমন ব্রহ্মপুত্র (ব্রহ্মা থেকে ব্রহ্মপুত্র), কপোতাক্ষ প্রভৃতি। এভাবেই এই প্রবাহগুলোকে নদ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে যেসব প্রবাহের সৃষ্টির সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক রয়েছে সেই প্রবাহগুলো নদী (স্ত্রীবাচক) নামে পরিচিত । যেমন- গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, ভাগীরথী প্রভৃতি। ধর্মীয় আবেগ থেকে পুরান মেনে নিলেও যুক্তি হিসেবে এটি ঠুনকো। বলা যায় অপযুক্তি। কারণ হিসেবে বলা যায় ব্রহ্মপুত্র নাগেশ্বরী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর বাহাদুরাবাদে যমুনা নাম ধারণ করে। ব্রহ্মপুত্র পুরুষবাচক নদী এবং যমুনা স্ত্রীবাচক। কিন্তু একই সঙ্গে একটি নদী পুরুষবাচক ও স্ত্রীবাচক উভয়ই হতে পারে না। আবার একইভাবে ব্রহ্মপুত্রের অপর অংশ নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ হয়ে যখন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়াতে আসে তখন তা মেঘনা নাম ধারণ করে। মেঘনা একটি স্ত্রীবাচক স্রোতস্বিনী। তাই বলা যায় পুরান অনুসারে নদ-নদীর পুরুষবাচক- স্ত্রীবাচক নামের যুক্তি এখানেও ধোপে টেকে না। আবার কখনো কখনো বলার চেষ্টা করা হয়, শাখা বিশিষ্ট স্রোতস্বিনী নদী এবং শাখাহীন স্রোতস্বিনী নদ । এটিও যুক্তির মানদন্ডে প্রতিষ্ঠিত নয়। কারণ ব্রহ্মপুত্র কে নদ বলা হলেও এর অনেকগুলো শাখা রয়েছে । যেমন- বংশী, শীতলক্ষ্যা, বানার, বিজনা, নরসুন্দা, সুতিয়া, ধলাই, ঝিনাই, ইচ্ছামতি (মানিকগঞ্জ), আড়িয়াল খাঁ (নরসিংদী) প্রভৃতি। একইভাবে কপোতাক্ষকে নদ বলা হলেও এরও অনেকগুলো শাখা রয়েছে। এগুলো যথাক্রমে- শিবসা, হাপরখালি, আর্পানগাসিয়া, ইছামতি (ঝিনাইদহ), কয়রা, কুরুলিয়া প্রভৃতি। কিছু সংস্কৃতি ও ভাষায় নদীর লিঙ্গযুক্ত নাম থাকলেও বলা যায় এই লিঙ্গান্তর সম্পূর্ণ সামাজিক এবং ব্যাকরণগত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ফরাসি ভাষায় 'Seine' নদীকে 'La Seine' ( স্ত্রীলিঙ্গ) এবং 'Rhine' নদীকে 'Le Rhine' (পুংলিঙ্গ) হিসেবে উল্লেখ করা হয় । নদীর বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে নদী বা River একটি 'জেনেরিক' শব্দ। এর কোন লিঙ্গান্তর হয় না।

নদীর সংজ্ঞার মত দেশে নদীর সংখ্যা নিয়েও রয়েছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি। প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক 'বাংলাদেশের নদ-নদী ' শীর্ষক গ্রন্থে ১১৮২ টি নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। গবেষণা সংস্থা সিইজিআইএস দেশে ৪৪৫টি নদীর কথা বলেছে এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় দেশে ৪৯৬ টি নদীর সংখ্যা উল্লেখ করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১১ সালে 'বাংলাদেশের নদ-নদী' শীর্ষক প্রকাশনায় ৪০৫ টি নদীর সংখ্যা উল্লেখের সঙ্গে নদীগুলোকে সংখ্যাবদ্ধ করেছে এবং প্রতিটি নদীর একটি পরিচিতি নম্বর দিয়েছে। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন ২০১৯ সালে ৭৭০ টি নদী, ২০২৩ এর ১০ আগস্ট ৯০৭ টি নদী এবং সর্বশেষ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এ ১০০৮ টি নদীর তালিকা প্রকাশ করেছে। সম্ভবত এটিও পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত তালিকা নয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে দেখা যায় এখনো কিছু নদী তালিকাভুক্ত হয়নি। সুন্দরবন এলাকার অসংখ্য নদী তালিকার বাইরে থেকে গেছে। অনেক আন্ত: সীমান্ত নদী স্বীকৃতি পায়নি । তবু জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের কৃতিত্ব এখানেই যে, এরকম একটি জনগুরুত্ব সম্পন্ন কাজে তারা মনোযোগ দিয়েছে। কারণ নদীর তালিকা তৈরীর সঙ্গে নদীর দখল-দূষণ প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক ও আন্ত:সীমান্ত নদীতে পানির অধিকার ও প্রাপ্যতার বিষয়টি জড়িত। তাই নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণ ও তালিকা তৈরির প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

নদীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটি উত্থাপন জরুরি সেটি হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়ায় নদীর তালিকা তৈরি অধিক বিজ্ঞানসম্মত । এটি প্রশাসনিক বিভাগভিত্তিক, কৌণিক অঞ্চলভিত্তিক, নাকি অববাহিকা ভিত্তিক হওয়া উচিত । বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কৌণিক অঞ্চলায়নের ভিত্তিতে দেশে নদীর তালিকা তৈরি করেছিল। তাদের তালিকায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ১০২ টি, উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ১১৫ টি , উত্তর -পূর্বা ঞ্চলে ৮৭ টি, উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৬১ টি, পূর্ব -পাহাড়ি অঞ্চলে ১৬ টি, এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ২৪ টি নদী দেখানো হয়েছিল। জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন নদীর উৎস ও পতন মুখ চিহ্নিত করলেও তাদের তালিকা মূলত উপজেলা, জেলা ও বিভাগ ভিত্তিক। বাস্তবে কৌণিক অঞ্চল এবং প্রশাসনিক বিভাগ অনুসারে যেমন নদীর সৃষ্টি হয় না ; তেমনি নদীর সমাপ্তিও ঘটে না। নদী সৃষ্টির ক্ষেত্রে পানির উৎস, ভূমির অঙ্গসংস্থান (Morphology ) এবং টপোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভূমির স্বাভাবিক ঢাল যেহেতু উত্তর থেকে দক্ষিনে তাই নদীগুলো ও উত্তর থেকে দক্ষিনে প্রবাহিত। এই কারণে উত্তর থেকে তিনটি প্রধান নদী ও নদী পদ্ধতি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এবং তাদের অসংখ্য শাখা প্রশাখা জালের ন্যায় পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত দেশে ছড়িয়ে থাকা শত শত নদীর আদি উৎস মূলত এই তিনটি প্রধান নদী। তাই দেশে নদীর তালিকা তৈরীর ক্ষেত্রে প্রধান নদীগুলির অববাহিকা ভিত্তিক তালিকা হতো অধিক যুক্তিসঙ্গত। এর ফলে নদীর শাখা-প্রশাখা গণনা অধিকতর নির্ভুল হতে পারতো।

কমিশনকৃত তালিকা পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় পাউবো প্রস্তুতকৃত পূর্ব তালিকার ২৩ টি নদী এখানে বাদ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাতটি নদী যথাক্রমে কালিন্দি, ঘাঘর, তেলিগঙ্গা, বুড়িশ্বর, বিশারকান্দা-বাগদা, শাতলা- হারতা- নাফার কান্দা নদী, ও সাপমারা-হাবড়া । উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছয়টি নদী যথাক্রমে-কুমলাল-নাওতারা, গিদারী নদী, বুল্লাই নদী, রামচন্ডী নদী, রাক্ষসিনী তেঁতুলিয়া নদী ও লেংগা । উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তিনটি নদী যথাক্রমে- বাউলাই নদী, বালই নদী ও মহারশি নদী। উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের পাঁচটি নদী যথাক্রমে- টঙ্গী নদী, নাঙ্গলা নদী, নাংলী নদী, বোশখালীর নদী ও লাবুন্ধা নদী। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুইটি নদী যথাক্রমে- ডাসাডিয়া নদী ও বিজলি নদী। কি কারনে এই নদীগুলোকে কমিশনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হল অথবা বাদ পড়ল তার ব্যাখ্যা প্রদান করা জরুরী ছিল।

উচ্চারণ বিভ্রাট

পাউবো ও কমিশনকৃত তালিকায় অনেক নদীর নামের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষণীয়। আঞ্চলিক সংস্কৃতিক কারণে উচ্চারণ ও ভাষাগতভাবে নামের ভিন্নতা প্রচলিত হলেও এক্ষেত্রে যেকোনো একটি নাম বা উচ্চারণকে স্বতঃসিদ্ধ ধরা উচিত ছিল। তালিকার ক্ষেত্রে এটি বড় ধরনের বিচ্যুতি না হলেও নির্ভুলতার জন্য এটি করা প্রয়োজন। উদাহরণগুলো যথাক্রমে- পাউবোতে 'অর্পণগাছিয়া' কমিশনে হয়েছে আপানগাসিয়া (৩১ নং)। পাউবোতে 'খালসিডিঙ্গি' কমিশনে 'খলিসাডাঙ্গা'(১৯৭ নং) । পাউবোতে 'ঘিরনাই' কমিশনে হয়েছে 'ঘৃণাই (২৭৭ নং) । পাউবোতে 'চিতলখালী নদী' কমিশনে 'চিল্লাখালী '(৩১৯ নং)। পাউবোতে 'জালিয়া' কমিশনে 'জালিয়াছড়া নদী' (৩৫৭ নং) । পাউবোতে 'গুমাই' কমিশনে 'গোমাই' (২৬০ নং)। পাউবোতে 'খাজাচিং' কমিশনে 'খাজাঞ্চি' (১৯৯ নং)। পাউবোতে 'চামতি নদী' কমিশনে 'চামটি' (৩০৪ নং)। পাউবোতে 'মালিজি নদী' কমিশনে হয়েছে 'মালিঝি' (৭৯৬ নং)। পাউবোতে তিনটি দীর্ঘ নাম যুক্ত একটি নদী (পাবিজুড়ি- কুশিগাঙ- কুশিয়া নদী) রয়েছে। কমিশন এটিকে একটি নামে দেখিয়েছে (পাবিজুড়ি কুশিগাঙ ৫৪১ নং) । একইভাবে পাউবোর নয়াগাং নদী, নয়া গাং নদী নামের দুইটি নদী কমিশনে একটি নদী হয়ে যায় নয়াগাং/ নয়াগাং(খাসিয়ামারা) ৪৮০ নং। এ ধরনের আরো অনেক নাম বিভ্রাট রয়েছে।

দ্বৈত নাম

পাউবো এবং কমিশনকৃত তালিকা পর্যালোচনা করলে আর এক ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। তালিকায় এক নামের একটি অথবা একাধিক নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কোনটি সঠিক নিরসন হওয়া প্রয়োজন। পাউবোর তালিকায় 'সতি- স্বর্ণামতি- ভাটেশ্বরী' নামে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মাত্র নদী রয়েছে। কিন্তু কমিশনকৃত তালিকায় সতি, স্বর্ণমতি ও ভাটেশ্বরী তিনটি আলাদা নদী। নদী তিনটির ক্রমিক যথাক্রমে ৯০৫ , ৯৭২ , ও ৭১৬ । পাউবোতে যমুনা নদী (পঞ্চগড়) নামে একটি নদীর উল্লেখ রয়েছে। কমিশনে ৮১৯ ও ৮২০ ক্রমিকে দুটি যমুনার অস্তিত্ব রয়েছে । পাউবোতে তিস্তা নদী, তিস্তা নদী (পঞ্চগড়) নামে দু'টি নদী দেখানো হয়েছে। কমিশনে তিস্তা একটি মাত্র নদী (৪০৮ নং) । তবে এটি মোটেই পঞ্চগড়ের নদী নয়। পাউবোতে কামারখালী নামে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি মাত্র নদী রয়েছে । কমিশনে কামারখালী নামের ১২৫ ও ১২৬ ক্রমিকে দু'টি নদী রয়েছে। একটি নেত্রকোণায় অন্যটি সুনামগঞ্জ- সিলেট জুড়ে। পাউবোতে তিতাস নদী, পুরনো তিতাস নদী নামে দুটি নদীর কথা বলা হয়েছে। কমিশনে ৪০৫, ৪০৬ ও ৪০৭ ক্রমিকে তিতাস নামে তিনটি আলাদা নদী দেখানো হয়েছে। পাউবোর তালিকায় উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে আইমান-আখিলা নদী এবং আইমান-মোবারি নদী নামে দু'টি নদীর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কমিশনের তালিকায় ২৮ নং ক্রমিকে 'আয়মান' নামের একটিমাত্র নদী দেখানো হয়েছে। এগুলোর ব্যাখ্যা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

অঞ্চল বিভ্রাট

কমিশনকৃত নদীর তালিকায় সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাটি হচ্ছে কোনো কোনো নদীর ক্ষেত্রে সম্ভবত অঞ্চল বিভ্রাট ঘটেছে। পাউবো একটি নদীকে যে অঞ্চলে উল্লেখ করছে, কমিশন তা অন্য অঞ্চলে দেখাচ্ছে । এটি অনবধানজনিত কিনা জানা প্রয়োজন। পাউবোর তালিকায় মরা জিঞ্জিরাম উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটি নদী। কিন্তু কমিশনের তালিকায় ৩৫৯ ক্রমিকে জিঞ্জিরাম কুড়িগ্রামের নদী এবং ৩৬০ ক্রমিকের জিঞ্জিরাম জামালপুরের একটি নদী। নদী দু'টির উৎস ও পতন মুখ উল্লেখ না থাকায় দু'টি একই নদী কিনা সন্দেহ থেকে যায়। পাউবোর তালিকায় সুতী উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটি নদী। কমিশনের তালিকায় ৯৫৫ ও ৯৫৬ ক্রমিকে সুতী নামে দু'টি আলাদা নদী রয়েছে । একটি ময়মনসিংহ বিভাগে এবং অন্যটিকে ঢাকা বিভাগে দেখানো হয়েছে। আসলে দু'টিই ময়মনসিংহ বিভাগে হবে। পাউবোতে কাটাখালি নামে উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে একটি নদীর কথা বলা হয়েছে। কমিশনের তালিকায় কাটাখালি নামে যথাক্রমে ১১০, ১১১ ও ১১২ ক্রমিকে তিনটি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে যা তিনটি বিভাগে ঢাকা, খুলনা, ও রংপুরে অবস্থিত। পাউবোতে চিলাই উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটিমাত্র নদী । কমিশনে তা ৩১৭ ও ৩১৮ ক্রমিকের দু'টি ভিন্ন নদী। একটি গাজীপুরে অন্যটি সুনামগঞ্জে। পাউবোতে বুড়ি নদী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী। কমিশনের তালিকায় বুড়ি নামের তিনটি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে। যাদের ক্রমিক যথাক্রমে- ৬৬৬, ৬৬৭, ও ৬৬৮ । এরমধ্যে প্রথমটি চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি যথাক্রমে সিলেটের ওসমানীনগরে অবস্থিত । আবার পাউবোর তালিকায় 'সোনাই' নদীকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বলা হলেও কমিশনের তালিকায় এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি নদী যার ক্রমিক নং ৯৬০ (হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) । পাউবোর তালিকায় মেঘনা আপার, মেঘনা লোয়ার নামে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে দু'টি নদীর উল্লেখ রয়েছে। কমিশনের তালিকায় ৮১১ থেকে ৮১৪ পর্যন্ত মেঘনার চারটি পৃথক নদীর উল্লেখ করা রয়েছে। এরমধ্যে ৮১১ নং ক্রমিকের মেঘনার প্রধান প্রবাহকে তিনটি বিভাগে যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ও বরিশালে দেখানো হলেও বাস্তবে তা হবে ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল জুড়ে চারটি বিভাগে।

পাউবোর তালিকায় আপার-লোয়ার নামকরণ করে পাঁচটি নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন নাগর আপার -নাগর লোয়ার, বড়াল আপার-বড়াল লোয়ার , মহানন্দা আপার-মহানন্দা লোয়ার , বানার আপার- বানার লোয়ার, মেঘনা আপার-মেঘনা লোয়ার প্রভৃতি। উৎস ও প্রবাহের এলাকা ভিন্নতর হওয়ায় কমিশন সেগুলোর সংশোধিত তালিকা করেছে। কিন্তু উৎস এক হওয়া সত্ত্বেও ১৬৬ ও ১৬৭ নং ক্রমিকের নদীকে যথাক্রমে কুমার আপার (মাদারীপুর) ও কুমার লোয়ার (মাদারীপুর) নামে দুটি পৃথক নদী হিসেবে দেখানো কতটুকু যৌক্তিক ভেবে দেখা যেতে পারে।

নদী তালিকায় এতসব অসঙ্গতি থাকার পরেও একটি কঠিন ও আয়াস সাধ্য কাজে মনোনিবেশ করার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। ভবিষ্যতে এই কাজ চলমান থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস । তবেই নদীর একটি নির্ভুল ও অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা যাবে এবং নদীর সংজ্ঞা, সংখ্যা ও গণনা বিষয়ক বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ,বগুড়া।

মেসেঞ্জার/সজিব

dwl
×
Nagad